জিজেকের ভায়োলেন্স: পুঁজিবাদী সমাজে বলপ্রয়োগের নতুন বিন্যাস – লেভিন আহমেদ (Levin Ahmed)

 

 

violence-zizek

বলপ্রয়োগ কথাটি কিভাবে আমাদের মনোজগতে ভেসে ওঠে — এই প্রশ্ন দিয়ে শুরু করা যাক। নিশ্চয় বলপ্রয়োগ সন্ত্রাস, সহিংসতা, খুন, উদ্বেগ ও টানটান উত্তেজনার মিশ্র আবহ নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়। জিজেকের মতে, ঠিক এখানেই পহেলা বিপত্তি ঘটার সম্ভাবনা; তাই এক কদম পিছিয়ে বুঝে শুনে তারপর অগ্রসর হওয়া জরুরি মনে করেন তিনি। ব্যক্তির বলপ্রয়োগ ও সহিংস কর্মকাণ্ডের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া এড়িয়ে পেছনের দিগন্তকে — যেখান থেকে এসব ঘটনাবলির উদয় ঘটে — ফর্সা করা জরুরি। কেননা এ প্রচেষ্টাই কেবল বলপ্রয়োগের স্বরূপ উন্মোচিত করতে পারে। ব্যক্তির বলপ্রয়োগ ও সামজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বলপ্রয়োগের তুলনামূলক সম্পর্ক বিচার ও দ্বিতীয়টি প্রথমটিকে কিভাবে উসকে দেয় তা নিরূপণ করাই জিজেকের বইয়ের প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয়। ব্যক্তির বলপ্রয়োগ ও ব্যবস্থার বলপ্রয়োগের তফাত টেনে জিজেক বলতে চান, ব্যক্তির বলপ্রয়োগ উদ্যাপনের ডামাডোলের ভেতরে আমরা নৈর্ব্যক্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বলপ্রয়োগের কথা হামেশাই ভুলে যাই। জিজেকের প্রস্তাব ব্যক্তির ও ব্যবস্থার বলপ্রয়োগের দ্বান্দ্বিক বিচারের মাধ্যমেই বলপ্রয়োগের সামগ্রিক পর্যালোচনা হাজির করা সম্ভব।

তিনি এই বইতে আরো দুই প্রকার বলপ্রয়োগের হদিস দেন: প্রতীকী বলপ্রয়োগ (সিম্বলিক ভায়োলেন্স) ও গায়েবি বলপ্রয়োগ (ডিবাইন ভায়োলেন্স)। প্রতীকী বলপ্রয়োগ প্রকৃতপক্ষে ভাষার মামলা। ভাষা এবং ভাষার অন্তর্গত কাঠামোর মধ্যেই এই বলপ্রয়োগ সূচিত হয়। ভাষার অর্থজগৎ কিভাবে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বাস্তবজগৎকে স্থানচ্যুত করে তার বিস্তারিত আলোচনা বইটিতে রয়েছে। গায়েবি বলপ্রয়োগের আলোচনায় জিজেক বাল্টার বেনিয়ামিনের দোহাই দিয়ে বলেন, গায়েবি বলপ্রয়োগ ইহজাগতিক বিষয়, পরলোকের সাথে তার সম্পর্ক অতি সামান্য। গায়েবি বলপ্রয়োগের সাথে সহিংসতা এবং রক্তপাতের প্রশ্ন জড়িত। জিজেকের অনুযোগ, কতিপয় বামঘরানার উদারনীতিবাদী বুদ্ধিজীবী ফানোঁ এবং বেনিয়ামিনের গায়েবি বলপ্রয়োগতত্ত্বের ঝাঁজকে প্রশমিত করতে চান। চলমান আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদী সমাজে উক্ত চার ধরনের বলপ্রয়োগের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আলোচনা করাই বইটির মূল উদ্দেশ্য।

প্রথম অধ্যায়ে জিজেক ব্যক্তি কর্তৃক বলপ্রয়োগ (সাবজেক্টিব ভায়োলেন্স) ও ব্যবস্থা কর্তৃক বলপ্রয়োগের (সিস্টেমিক ভায়োলেন্স) পার্থক্য নির্দেশ করেন। এই পর্যন্ত বলপ্রয়োগের চরিত্র বিচারে নৈর্বাক্তিক-প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা প্রতীকী বলপ্রয়োগকে অগ্রাহ্য করে তাত্ত্বিকগণ শুধুমাত্র ব্যক্তির বলপ্রয়োগের ঘটনাকে প্রাধান্য দিয়ে এসেছেন। জিজেক এই বইতে দান উল্টিয়ে দিয়ে বলছেন, পুঁজিবাদী সমাজে সাংগঠনিক কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক বলপ্রয়োগের মর্ম বোঝা জরুরি। কারণ অদৃশ্য সিস্টেমিক বলপ্রয়োগই তার বিপরীতে ব্যক্তির বলপ্রয়োগের ঘটনার জন্ম দেয়। এখন ব্যক্তির বলপ্রয়োগকে আমরা কিভাবে বিচার করব? সোজা কথায়, এই বলপ্রয়োগ ব্যক্তির দ্বারাই সংঘটিত হয়ে থাকে। ব্যক্তির বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি, এই লোক এই বলপ্রয়োগের ঘটনার জন্য দায়ী। কিন্তু নৈর্ব্যক্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বলপ্রয়োগের হোতা শনাক্ত করা সহজ নয়। যেমন সহজ নয় অর্থনৈতিক মন্দার জন্য দায়ী ব্যক্তি শনাক্ত করা। ব্যক্তির বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে যেমন আমরা নিজেদের দায়ী মনে করি, তেমনি — জিজেকের প্রস্তাব — নৈর্ব্যক্তিক, প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা সাংগঠনিক বলপ্রয়োগের দায়ও আমাদের উপর বর্তায়।

জিজেক এখানে ক্ষমতার (আইনসম্মত কর্তৃত্ব অর্থে) সাথে বলপ্রয়োগের পার্থক্য টেনে বলছেন, সত্যিকার নেতৃত্বের কখনো বলপ্রয়োগের দরকার পড়ে না। কেবলমাত্র ব্যর্থ নেতৃত্বেরই বলপ্রয়োগের দরকার পড়ে। পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা সাধারণত বলপ্রয়োগের উপর ভিত্তি করেই টিকে থাকে। পুঁজির বেপরোয়া গতি অব্যাহতভাবে বলপ্রয়োগের ঘটনা ঘটিয়ে চলে যা কিনা স্বাভাবিক বলেই মেনে নেওয়া হয়। লেখক এই স্বাভাবিক অবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। এভাবে জিজেক পুঁজিবাদের বলপ্রয়োগের চরিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে লিবারেল, অহিংস, উন্নয়নবাদী প্রপাগান্ডার মুখোশ উম্মোচিত করেছেন। জিজেকের অন্তর্দৃষ্টি: মার্কেটকে অবারিত রাখতে হলে পুঁজিবাদের বলপ্রয়োগের আশ্রয় নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু এই বলপ্রয়োগের হোতা হিশেবে কাউকে শনাক্ত করা বা দোষী করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। জিজেক বলছেন, তাই বলে আমরা নিজেদের দায় এড়িয়ে যেতে পারি না। এই সহিংসতার জন্য আমরাও সম্যকভাবে দায়ী।

আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ বিস্তারের কারণ জিজেকের মতে পুঁজিবাদের আগ্রাসী চরিত্রের মধ্যেই নিহিত। সন্ত্রাসবাদীরা বলপ্রয়োগের আশ্রয় নিয়ে পুঁজির একচেটিয়া দাপটের মুখে নিজের অস্তিত্ব জানান দিতে চায় যা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের মাধ্যমে সম্ভব হয়ে ওঠে না। পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় কোণঠাসা হয়ে পড়া জনগোষ্ঠীসমূহের সামগ্রিক অসন্তোষের মধ্যেই এরূপ সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের কারণ খুঁজতে হবে। বিপদের বিষয় হল ব্যক্তির বলপ্রয়োগের দৃষ্টিগ্রাহ্যতা ও স্পর্শকাতরতার ফলে তা প্রাতিষ্ঠানিক বলপ্রয়োগের মাত্রাকে ছাড়িয়ে যায়। ফলে ব্যক্তির বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক বলপ্রয়োগ প্রায়শই বৈধতা পায়।

জিজেক শুধু নৈর্ব্যক্তিক বলপ্রয়োগের চরিত্র বিশ্লেষণ করেই ক্ষান্ত হননি, ‘বলপ্রয়োগ’ বইয়ে তিনি প্রতীকী বলপ্রয়োগের স্বরূপ উদ্ঘাটনের প্রয়াস পেয়েছেন। এই বলপ্রয়োগ আধিপত্যশীল ডিসকোর্সের ভাষাভঙ্গির মধ্যে নিহিত থাকে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে জিজেক প্রশ্ন তুলেছেন, কেন বাসনাময় কর্তা হিশেবে অপরের সান্নিধ্য আজ ভয়ের কারণ হয়ে উঠেছে? কেন অপরের সম্ভোগ-বাসনাকে প্রশমিত করার জন্য এত তোড়জোড়? অপরকে দূরে সরিয়ে রাখা প্রতীকী দেয়াল ভাঙ্গনের সম্ভাবনা থেকেই এই ভয়ের সূত্রপাত। ফ্রয়েড বহু আগেই বলেছেন, প্রতিবেশী হল সেই অনাকাক্সিক্ষত অনুপ্রবেশকারী যার সম্ভোগপ্রণালি আমাদের বিরক্ত করে। তাই প্রতিবেশী যখন সীমা অতিক্রম করে ব্যক্তিগত জীবনে অনুপ্রবেশ করার চেষ্টা করে তখন তা তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। রটনা আছে, পাশ্চাত্য সভ্যতা অন্যান্য সভ্যতার চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি উদার ও সহনশীল। জিজেক বলছেন এই রটনার কারণ পাশ্চাত্যে সামাজিক জীবনের অনুপস্থিতি। সমাজে ব্যক্তির প্রতিদিনকার জীবনযাত্রায় পারস্পরিক দূরত্বের মধ্যে এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতা প্রোথিত। অর্থাৎ পাশাপাশি থেকে যে যার মত জীবনযাপন করছে কিন্তু কেউ কারও সাথে মিশছে না। এই পরিস্থিতিতে সমাজজীবনের এই বিচ্ছিন্নতা সমস্যার পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের একমাত্র সমাধান হিশেবে দেখা দিয়েছে।

জিজেক বলেন হজরত মুহাম্মদের (সাঃ) ব্যঙ্গচিত্র নিয়ে মুসলিমবিশ্বের প্রতিক্রিয়া ছিল আসলে মুহাম্মদকে (সাঃ) ঘিরে পাশ্চাত্যের মনোভাবের বিরুদ্ধে তাদের অসন্তোষের প্রকাশ। মুসলিম দেশগুলো যেমন পাশ্চাত্যকে ভুল দৃষ্টিতে দেখছে, ঠিক তেমনি পাশ্চাত্যও প্রাচ্যকে ভুলভাবে পাঠ করছে। বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ ও সন্ত্রাসকে ব্যাখ্যা করতে হলে — জিজেক বলছেন — আমাদের ভাষার গঠনের দিকে নজর ফেরাতে হবে। কারণ ভাষা বলপ্রয়োগের অন্যতম হাতিয়ার। ভাষাই বস্তুর উপর গুণ ও অর্থারোপ করে যা সেই বস্তুর নিজস্ব নয়। বস্তুর এই অযাচিত নামকরণ বলপ্রয়োগের নামান্তর বৈকি। লাকাঁ বলছেন ব্রহ্মপদ (মাস্টার সিগনিফায়ার) প্রতীকীজগৎকে একটি সুনির্দিষ্ট আকৃতি দেয়। প্রতিটি শব্দ ব্রহ্মপদের সাপেক্ষে অর্থলাভ করে থাকে। কিন্তু ব্রহ্মপদ কোন যুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। ব্রহ্মপদ নিজেই নিজের জোরে টিকে থাকে এবং তা অন্য কোন শব্দের সাপেক্ষে অর্থলাভ করে না। ব্রহ্মপদের এই প্রতিষ্ঠা এবং অন্যান্য পদের সাপেক্ষে তার অর্থপ্রাপ্তি চূড়ান্ত বলপ্রয়োগের উপরই টিকে থাকে। তাই আমরা দেখতে পাই ভাষাকে — যা পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যম — আশ্চর্য ব্যাপার বলে মনে হলেও তা চূড়ান্ত বিচারে বলপ্রয়োগের মাধ্যমেই টিকে থাকে। ভাষাই প্রকৃত মানদণ্ড ঠিক করে দেয়, ভাষাই বলে দেয় কোনটি বলপ্রয়োগ আর কোনটি বলপ্রয়োগ নয়।

২০০৫ খ্রিস্টাব্দের বসন্তকালীন সময়ে ফ্রান্সে ঘটে যাওয়া দাঙ্গা ও আমেরিকায় আছড়ে পড়া হারিকেন ক্যাটরিনার দুর্যোগ পরবর্তী লুটের ঘটনাকে বিশ্লেষণ করে জিজেক বলেন, ১৯৬৮ সালের মে মাসে ফ্রান্সে ঘটে যাওয়া দাঙ্গার সাথে এই দুই ঘটনার উল্লেখযোগ্য তফাত রয়েছে। ১৯৬৮ সালের বিদ্রোহে যে এয়ুটোপীয় স্বপ্ন ছিল — জিজেক বলছেন — তা সাম্প্রতিক দাঙ্গাগুলোতে পরিলক্ষিত হয়নি। অর্থাৎ এই সহিংস বিক্ষোভগুলো কোন এয়ুটোপীয় প্রকল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে না। অর্থহীনতার মাঝেই শেষ পর্যন্ত তা মিলিয়ে যাচ্ছে। কারণ হিশেবে জিজেক বলেন, উত্তর-মতাদর্শিক যুগে সহিংস বিক্ষোভ কোন সুনির্দিষ্ট দাবিদাওয়াকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হচ্ছে না, বরং রাষ্ট্র ও প্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের ফলে এইসব সহিংস বিক্ষোভের ঘটনা ঘটছে। পুঁজির দাপটের মুখে কোণঠাসা হয়ে পড়া মানুষ সহিংস বিক্ষোভের মধ্য দিয়েই নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। তাদের কোন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কিংবা দাবিদাওয়া নেই। মূলকথা হল তারা বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় স্বাচ্ছন্দ বোধ করছে না, নিজেদের মানিয়ে নিতে পারছে না। প্রসঙ্গত কিছুদিন আগে ওয়াল স্ট্রিটকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিক্ষোভ সম্পর্কে জিজেক একই মন্তব্য করেন। তবে কোন কোন মার্কসবাদী তাত্ত্বিক (যেমন চায়না মিয়েভিল) জিজেকের এই তত্ত্বের সাথে দ্বিমত পোষণ করে বলেছেন, সাম্প্রতিক অকুপাই মুভমেন্টগুলোতে বিক্ষোভকারীরা সুনির্দিষ্ট দাবিদাওয়াকে কেন্দ্র করেই সমবেত হয়েছে।

ইউরোপ কয়েকশত বছর সময়ব্যাপী পুঁজিবাদী বিকাশের মধ্য দিয়ে আধুনিকতার স্বরূপ দেখেছে যে সময়টাতে প্রায় সেই সময়েই বিজ্ঞান আধিপত্যশীল ডিসকোর্স হিশেবে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে পেরেছে। কিন্তু মুসলিম বিশ্বে এই পরিবর্তন এসেছে আচমকা, ফলে পুঁজি তাদের প্রতীকীজগৎকে নৃশংসভাবে ছিন্নভিন্ন করতে পেরেছে। তারা তাদের ধর্মাশ্রিত প্রতীকীজগৎ হারিয়েছে, কিন্তু নতুন কোন প্রতীকীজগৎ বিনির্মাণের অবকাশ পায়নি। ফলে অকস্মাৎ পরিবর্তনে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তারা ধর্মাশ্রিত উগ্রপন্থী রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ছে। জিজেক এই পর্যায়ে এসে ‘ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদী’দের মনোঃবিশ্লেষণের প্রয়াস পেয়েছেন। তিনি বলেন, তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে তারা নিজেরা সংশয়ান্বিত বলেই অপরের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে তারা তাদের নিজেদের নাজুকতাকে আড়াল করতে চান।

হারিকেন ক্যাটরিনার দুর্যোগপরবর্তী সময়ে কালদের দ্বারা ধর্ষণ ও লুট সংক্রান্ত যেসব খবর মিডিয়া প্রচার করেছিল তা পরবর্তীতে ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হয়। তার উল্লেখ করে জিজেক বলেন, আধিপত্যশীল ডিসকোর্সসমূহ বর্ণবাদী, সাম্প্রদায়িক, পুরুষতান্ত্রিক ফ্যান্টাসিতে ভরপুর যা লিবারেল ভদ্রলোকেরা প্রকাশ্যে স্বীকার করতে লজ্জাবোধ করেন। লিবারেল তাত্ত্বিকগণ সীমান্তের কাঁটাতারকেই বিশ্বজনীন ভাতৃত্বের সবচেয়ে বড় বাধা মনে করেন। জিজেক তাদের সমালোচনা করে বলছেন, সীমান্ত কাঁটাতারমুক্ত করলেই বিদ্যমান আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাবলির সমাধান হবে না; সত্যিকার আর্থসামাজিক বৈষম্যের বেড়াজাল মুক্ত করলেই বিশ্বজুড়ে চলমান সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব। বলা বাহুল্য, তা উদারনীতিবাদী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে সম্ভব নয়।

 

 

 

স্লাভয় জিজেক

চতুর্থ অধ্যায়ে জিজেক যুক্তির অন্তর্নিহিত অসঙ্গতিগুলোকে তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন। এমানুয়েল কান্টের দোহাই দিয়ে লেখক বলছেন, একটি প্রশ্নের দুইদিক থেকেই ন্যায্য তর্ক তোলা সম্ভব। যেমন এই মহাবিশ্ব সসীম এবং অসীম দুটিই আমরা প্রমাণ করতে পারি। কান্ট বলছেন, যুক্তির মধ্যকার এই পারস্পরিক বিরোধের নিষ্পত্তি যদি সম্ভব না হয় তবে মানবতা এক নিরানন্দ সংশয়ের মধ্যে নিপতিত হবে। অনুরূপভাবে, একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে একজন মুসলিম ও একজন উদারনীতিবাদী খ্রিস্টানের পরস্পরবিরোধী যুক্তি থাকতে পারে। হজরত মুহাম্মদের (সাঃ) ব্যঙ্গচিত্রকে ঘিরে মুসলিম বিশ্বের অসন্তোষ এবং এই অসন্তোষকে ঘিরে পাশ্চাত্যের সমালোচনাকে তিনি এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন।

তারপর তিনি গণহত্যার ঘটনাকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি বাহিনী কর্তৃক ইহুদি নিধনের দোহাই তুলে ইসরায়েল যেমন অপরের অনুকম্পা জাগিয়ে পরদেশ দখল করে, ঠিক তেমনি মুসলিম দেশগুলি (বিশেষ করে ইরান) ইসরায়েলের নৃশংসতা প্রমাণ করতে গিয়ে ইহুদিদের গণহত্যার বিষয়টি বেমালুম চেপে যায়। পাশাপাশি স্বাধীনতা ব্যবসায়ী সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদীদের ভণ্ডামি, তাদের অবদমিত বর্ণবাদ, ইসলাম বিদ্বেষ ও ইউরোপকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদকে এই অধ্যায়ে কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। বের্টল্ট ব্রেখট বলেছিলেন, ব্যাঙ্ক ডাকাতির ঘটনা নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার চেয়ে নগণ্য নয় কি? অনুরূপভাবে জিজেক প্রশ্ন তুলেছেন, রাষ্ট্রের আইনবহির্ভূত বলপ্রয়োগ রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগের চেয়ে তুচ্ছ নয় কি?

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন বিবাদের প্রসঙ্গ তুলে তিনি ইসরায়েল রাষ্ট্রের ‘বেআইনি’ বলপ্রয়োগের সমালোচনা করেন। এই বিবাদের সমাধানকল্পে তিনি জেরুজালেমকে তৃতীয় পক্ষের তত্ত্বাবধানে রাখার প্রস্তাব করেন। অতঃপর তিনি সন্ত্রাস ও মুক্তিকামী জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ের মধ্যকার ভেদরেখা চিহ্নিতকরণের জটিলতার বিষয়টি খোলাসা করেন। রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ধর্মকে মোকাবেলায় সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ ও উদারনীতিবাদের ব্যর্থতার আলোচনা করে জিজেক বলেন বর্তমানে নিরীশ্বরবাদের পতাকাতলেই সকল ধর্ম সমবেত হতে পারে। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিপ্লবী নিরীশ্বরবাদই সত্যিকার ধর্ম হিশেবে বিশ্বজনীন আবেদন নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হতে পারে।

পঞ্চম অধ্যায়ে জিজেক রাজনৈতিক সমস্যাগুলোকে সংস্কৃতির মামলা বলে চিহ্নিত করার উদারনীতিবাদী (লিবারেল) কৌশলের সমালোচনা করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন আজকের দিনের যাবতীয় সমস্যাগুলোকে কেন শুধুমাত্র সহনশীলতার অভাবজনিত সমস্যা হিশেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে? কেন এই সমস্যাগুলোকে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য ও অন্যায়জাত সমস্যা হিশেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে না? কেন এই আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাগুলোর সমাধান হিশেবে রাজনৈতিক সংগ্রামের পরিবর্তে সহনশীলতার নীতিকে প্রস্তাব করা হচ্ছে? কারণ রাজনীতিকে সংস্কৃতির খোপে ঢোকানো (কালচারাইজেশন অব পলিটিক্স) উদারনীতিবাদী ও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদীদের (মাল্টিকালচারালিস্ট) মতাদর্শিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যজাত সমস্যাগুলোকে তাই সাংস্কৃতিক সমস্যা হিশেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তার কারণ হিশেবে জিজেক ইঙ্গিত করেন, বিদ্যমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রকাঠামো বজায় রেখে এই আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান সম্ভব নয় বলেই সাংস্কৃতিক ভিন্নতার দিকে আমাদের নজর সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই প্রসংগে স্যামুয়েল হান্টিংটনের সভ্যতার আন্তঃসংঘর্ষ (ক্ল্যাশ অব সিবিলাইজেশনস) তত্ত্বের সমালোচনা করেন তিনি। ফ্রাঁসোয়া ফুকুয়ামার ‘ইতিহাসের যবনিকাপাত’ (এন্ড অব হিস্ট্রি) গ্রন্থে উদারনৈতিক গণতন্ত্রকেই রাজনৈতিক ব্যবস্থার সম্ভাব্য চূড়ান্তরূপ বলে ঘোষণা দেন। এখানে জিজেক ফুকুয়ামাকেও ছেড়ে কথা বলেননি। বেনিয়ামিনকে উদ্ধৃত করে তিনি রাজনীতিকে সংস্কৃতির খোপে ঢোকানোর পরিবর্তে সংস্কৃতিকে রাজনীতির আলোকে দেখার প্রস্তাব রাখেন। পরিশেষে সামাজিক পরিসর (সোশাল স্ফিয়ার) ও ব্যক্তিগত পরিসর (প্রাইবেট স্ফিয়ার) নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় তিনি বলেন এই দুই পরিসরের কার্তেসীয় বিভাজনের মাধ্যমেই উদারনৈতিক জ্ঞানতত্ত্বের ভীত টিকে থাকে।

ষষ্ঠ অধ্যায়ে জিজেক গায়েবি বলপ্রয়োগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। হিচককের ‘সাইকো’ ছবির গোয়েন্দা খুনের দৃশ্যে গডস-পয়েন্ট-অব-ভিয়ু শট ব্যবহারের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, মাঝে মাঝে খোদা আসমান থেকে জমিনে নেমে আসেন। মজলুমের পক্ষে তিনি দুনিয়াবি ঘটনায় হস্তক্ষেপ করেন এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ইনসাফ কায়েম করেন। ন্যায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উপরওয়ালার এই বেআইনি বলপ্রয়োগকেই জিজেক গায়েবি বলপ্রয়োগ নামে চিহ্নিত করতে চান। বাল্টার বেনিয়ামিনের ইতিহাসের দর্শন সংক্রান্ত থিসিসে (থিসিস অন দ্য ফিলসফি ইন হিস্ট্রি) তিনি পল ক্লির বিখ্যাত চিত্র ‘এঞ্জেলাস নুভো’র প্রসঙ্গ তোলেন। চিত্রটির দোহাই দিয়ে জিজেক বলেন ইতিহাসের ফেরেশতা (এঞ্জেল অব হিস্ট্রি) যদি অন্যায়-স্তুপে হস্তক্ষেপ করে প্রগতির নারকীয় যজ্ঞ থামিয়ে দিতেন তবে যে কাণ্ডটি ঘটত তাই গায়েবি বলপ্রয়োগের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

এখন প্রশ্ন হল গায়েবি বলপ্রয়োগের কোন নৈর্ব্যক্তিক মাপকাঠি আছে কিনা। বলপ্রয়োগের ঘটনার সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গের কাছে যা উপরওয়ালার আদেশ, তা বাইরের দর্শকের কাছে নিছকই ব্যক্তির নৈরাজ্যের নামান্তর ছাড়া আর কিছু মনে নাও হতে পারে। কোন বলপ্রয়োগের ঘটনাকে গায়েবি বলে গণ্য করার ঝুঁকি তাই পুরোটাই ব্যক্তির উপর বর্তায়। গায়েবি বলপ্রয়োগের মাজেজা চিরকালই আইনি ক্ষমতার কাছে আজগুবি ঠেকে। জিজেকের মতে, গায়েবি বলপ্রয়োগের মাধ্যমেই আশেকের সাথে মাসুকের প্রকৃত প্রেমের সূচনা ঘটে।

 

 

220px-Slavoj_Zizek_in_Liverpool_2

এই বইতে জিজেক পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার প্রেক্ষিতে বলপ্রয়োগের নানা প্রকারভেদ আলোচনা এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক বিচারের প্রয়াস পেয়েছেন। সেই সাথে বর্তমান বিশ্বের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সঙ্কট মোকাবেলায় উদারনীতিবাদী ও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদীরা যেসব সমাধান বাতলে দিচ্ছেন সেগুলোর সামগ্রিক সমালোচনাও হাজির করার চেষ্টা করা হয়েছে। লেখক বলপ্রয়োগের আপাত মোহে রোমাঞ্চিত না হয়ে বইটিতে তার আসল সুরত দেখানোর চেষ্টা করেছেন। অহিংস উন্নয়নবাদী নীতির পথ পরিহার করে জিজেক খোলাখুলিভাবেই এখানে বাতিলের বিরুদ্ধে হক প্রতিষ্ঠার জন্য সংঘটিত বলপ্রয়োগের পক্ষ নিয়েছেন। যারা প্রাতিষ্ঠানিক বলপ্রয়োগকে আড়াল করে তার বিপরীতে পরিচালিত ব্যক্তির বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেন জিজেক তাদের মুখোশ উন্মোচিত করেছেন। পুঁজিবাদী সমাজে বলপ্রয়োগের কারণ হিশেবে তিনি প্রতিবেশী-ভীতিকে চিহ্নিত করেন এবং এই বলপ্রয়োগ যে আসলে ভাষার মামলা তা খোলাসা করেন। ভাষা প্রকৃত বলপ্রয়োগকে পাশ কাটিয়ে তাকে প্রতীকী বলপ্রয়োগ আকারে হাজির করে। বর্তমান সময়ে উদারনীতিবাদীদের প্রধান মতাদর্শিক হাতিয়ার হিশেবে সহনশীলতানীতির সীমাবদ্ধতাকে তুলে ধরেন তিনি। তারপর বাল্টার বেনিয়ামিনের দোহাই তুলে তিনি বিদ্যমান সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের উপায় হিশেবে গায়েবি বলপ্রয়োগের বিপ্লবী দিকগুলোর উপর আলোকপাত করেন। জিজেকের শেষ কথা হল নিষ্ক্রিয়তা বর্তমান সময়ের প্রধান হুমকি নয়। বরং বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার তৎপরতা, লিবারেল অন্তঃসারশূন্যতাকে ঢাকার ব্যর্থ প্রচেষ্টা, আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যা মিটিয়ে ফেলার বাস্তবতা বিবর্জিত উদ্যোগই বর্তমান সময়ের প্রধান হুমকি। জিজেকের মতে কখনো কখনো চূড়ান্ত অসহযোগ বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর বলপ্রয়োগের মাধ্যম হতে পারে।

স্লাভয় জিজেক, ভায়োলেন্স: সিক্স সাইডওয়েস রিফ্লেকশন্স (পিকাডর, ২০০৮)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s